ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

ড্রাগন ফল (Dragon Fruit) একটি উচ্চমূল্যের, পুষ্টিকর ও লাভজনক ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Hylocereus undatus। এটি ক্যাকটাস জাতীয় বহুবর্ষজীবী ফলগাছ। বর্তমানে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১.⁠ ⁠মাটি ও জলবায়ু

  • বেলে দোআঁশ থেকে দোআঁশ মাটি সর্বোত্তম
  • পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো হতে হবে
  • জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমান বেশি থাকলে ভালো।

মাটির pH: ৫.৫ – ৭.০ উপযুক্ত জলবায়ু: উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া  ভালো
তাপমাত্রা: ২০–৩৫°C
মাঝারি বৃষ্টিপাত উপযোগী পর্যাপ্ত সূর্যালোক প্রয়োজন।

২.⁠ ⁠চাষের সময়: রোপণের উপযুক্ত সময়

এপ্রিল – সেপ্টেম্বর মাস উত্তম বর্ষার শুরুতে রোপণ করলে ভালো বৃদ্ধি হয়।সেচের ব্যবস্থা থাকলে বছরজুড়েও রোপণ সম্ভব।

৩.⁠ ⁠জাত নির্বাচন

বাংলাদেশে প্রধানত ৩ ধরনের ড্রাগন ফল দেখা যায়—

  • (ক) সাদা শাঁসযুক্ত: খোসা লাল, ভেতরে সাদা শাঁস (সবচেয়ে বেশি চাষ হয়)।
  • (খ) লাল শাঁসযুক্ত: খোসা লাল, ভেতরে লাল শাঁস (বাজারমূল্য বেশি)
  • (গ) হলুদ খোসাযুক্ত: খোসা হলুদ (তুলনামূলক কম চাষ হয়)

উন্নত জাত:

BAU Dragon Fruit-1, Vietnam White, Vietnam Red, American Beauty, Physical Graffiti

৪.⁠ ⁠জমি প্রস্তুতি: জমি ৩–৪ বার চাষ দিতে হবে

  • (ক)আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং মই দিয়ে সমান করতে হবে।
  • (খ)পিট তৈরি: গর্তের আকার: ৬০ × ৬০ × ৬০ সেমি
    গাছ থেকে গাছ দূরত্ব: ২.৫ মি × ২.৫ মি
    প্রতি গর্তে ৪টি চারা।

৬.⁠ ⁠সার ব্যবস্থাপনা

গর্তে প্রাথমিক সার

  • পচা গোবর: ১৫–২০ কেজি
  • টিএসপি: ২০০ গ্রাম
  • এমওপি: ১৫০ গ্রাম
  • জিপসাম: ১০০ গ্রাম
  • জৈব সার: পর্যাপ্ত

প্রতি গাছের বার্ষিক সার

সারের নাম  পরিমাণ
ইউরিয়া ৩০০–৪০০ গ্রাম
টিএসপি ২০০–৩০০ গ্রাম
এমওপি ২০০–২৫০ গ্রাম
গোবর ১০–১৫ কেজি
জিঙ্ক সালফেট ২০–৩০ গ্রাম
বোরন ১০–১৫ গ্রাম

 

বছরে ৩–৪ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে।

৭.গাছের সার্বিক বৃদ্ধি ও সবুজের জন্য নিম্নোক্ত সার গুলা ব্যবহার করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।

NPK 19-19-19 
 ব্যালেন্সড সার। নতুন ডালপালা বের হলে বা গাছ দুর্বল থাকলে ব্যবহার করুন।

✅ বেশি ফুল ও ফল সেটের জন্য NPK 0-52-34 / NP 12-61-0
 ফসফরাস বেশি থাকে। ফুল আসার ২০–৩০ দিন আগে দিলে শিকড় মজবুত হয় ও ফুল বাড়ে।

✅ ফল বড় ও মিষ্টি করার জন্য NPK 0-0-50 / 13-0-45
 পটাশ সমৃদ্ধ। ফল মটর দানার মতো হলে প্রয়োগ করুন। ফল ঝরা কমে, রঙ ও স্বাদ বাড়ে।

✅ ফল ফাটা রোধে Calcium Nitrate
 ফল শক্ত ও চকচকে করে।

৮.⁠ ⁠পিজিআর (PGR) প্রয়োগ

PGR = Plant Growth Regulator
ড্রাগন ফলে ফুল ও ফল বৃদ্ধি, ফল ঝরা কমানো এবং ফলের আকার বৃদ্ধির জন্য PGR ব্যবহার করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ PGR

৯.⁠ ⁠ইন্টারকালচার অপারেশন

(ক) আগাছা দমন

নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
অথবা গ্লাইফোসেট (Glyphosate) গ্রুপের আগাছানাশক ব্যবহার করতে হবে(খেয়াল রাখতে হবে যাতে  ড্রাগন গাছের সংস্পর্শে  না আসে।

(খ) ছাঁটাই (Pruning)

অতিরিক্ত ডাল অপসারণ
রোগাক্রান্ত ডাল কেটে ফেলতে হবে

(গ) মালচিং

খড় বা পলিথিন ব্যবহার
মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে

(ঘ) গাছ বেঁধে দেওয়া

খুঁটির সাথে ডাল বেঁধে দিতে হবে

(ঙ) পরাগায়ন

হাতে পরাগায়ন করলে ফলন বাড়ে।

(চ) সেচ

শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সেচ
বর্ষায় পানি জমতে না দেওয়া।

১০.⁠ ⁠পোকামাকড় দমন:

(ক) মিলিবাগ: 
লক্ষণ: সাদা তুলার মতো আবরণ দমন আক্রান্ত অংশ অপসারণ করতে হবে। অথবা

নিম তেল যেমন : আজোম্যাক্স অথবা
ইমিডাক্লোপ্রিড(এডক্লোপ,সলোমন, ইমিটাপ,কনফিডর,এডমায়ার)  ব্যবহার করে মিলিবাগের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যায়।

(খ) এফিড:গাছের রস শোষণ করে ফলে ডাল কুঁকড়ে যায় এবং পাতায়/ডালে আঠালো পদার্থ (Honeydew) জমে পরে কালো ছত্রাক (sooty mold) হয়।এটি দমনে 
ইমিডাক্লোপ্রিড (এডক্লোপ,সলোমন, ইমিটাপ,কনফিডর,এডমায়ার) 
থায়ামেথক্সাম (আলিকা, ভলিয়াম ফ্লেক্সি) ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।

(গ) ফল মাছি: ফলে ছিদ্র করে ফলের ক্ষতি করে।মাছি পোকা দমনের কার্যকরী উপায় হলো

ফেরোমন ফাঁদ: ট্র্যাপ-আইবিটি + কিউফেরো লিউর

১১.⁠ ⁠ছত্রাকজনিত রোগ

  • (ক) অ্যানথ্রাকনোজ: কালো দাগ ফল পচে যায়।যার ফলে গাছ মারা যায়।এই অবস্থায় আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলা বা 
    কপার অক্সিক্লোরাইড গ্রুপ যেমন: ব্লিটক্স স্প্রে করতে হবে
  • (খ) স্টেম রট: এই রোগে কাণ্ড পচে যায়। এই রোগ  থেকে মুক্তি পেতে হলে,জমিতে পানি জমতে না দেওয়া।এবং 
    কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (সাফ,ন্যাক্সুমিন,বেনডাজিম,ভি-৩ ইত্যাদি) স্প্রে করতে হবে
  • (গ) ফল পচা রোগ: এই রোগের কারণে ড্রাগনে পচঁন ধরে ফলে ফল নষ্ট হয়ে যায়।এ থেকে মুক্তি পেতে
    কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (সাফ, ন্যাক্সুমিন,বেনডাজিম অথবা ভি-৩ ইত্যাদি) স্প্রে করতে হবে।
  • (ঘ) ব্যাকটেরিয়াল সফট রট: আক্রান্ত অংশ অপসারণ এবং ব্যাকটেরিয়া নাশক যেমন: ব্লিটক্স, ব্যাক্টাফ, প্ল্যান্টোমাইসিন, বায়ো এলিন ইত্যাদি স্প্রে করতে হবে।

১২.⁠ ⁠ফল সংগ্রহ

ফুল আসার ৩০–৩৫ দিন পরে ফল সংগ্রহ
ফল গাঢ় লাল হলে সংগ্রহ করতে হবে।

১৩.⁠ ⁠ফলন

প্রতি গাছে বছরে ২০–৩০ কেজি
হেক্টরপ্রতি ১৫–২০ টন পর্যন্ত ফলন।

১৪.⁠ ⁠অর্থনৈতিক গুরুত্ব: উচ্চ বাজারমূল্য

রপ্তানির সম্ভাবনা পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ কম জমিতে বেশি লাভ।

Back to blog

Leave a comment